পশ্চিমা দর্শন, পরিভাষা এবং সোশ্যাল সাইন্সের ডিসিপ্লিনগুলোর ক্ষেত্রে বিভিন্ন মাত্রায় একটা ভুল আমরা সবাই করি। ভুলটা হল এই ডিসিপ্লিন ও দর্শনগুলোর উৎসের দিকে না তাকানো। যার কারনে আমরা এইসব দর্শন, ডিসিপ্লিন ও ইন্সটিউটগুলোকে মেনে নিয়ে এর মধ্যে আমাদের নিজেদের জন্য একটা জায়গা তৈরি করে নিতে চেষ্টা করি। এবং উম্মাহর সব সময়, শ্রম প্রচেষ্টা মোটা দাগে এই কাজেই ব্যয় হচ্ছে।

এখানে মৌলিক সমস্যার শুরু হল ইউরোপের এনলাইটেনমেন্টের দার্শনিক কাঠামোর ফসল হিসেবে বের হয়ে আসা সামাজিক বিজ্ঞানগুলোকে নিরপেক্ষ (value-neutral) ধরে নিয়ে সেগুলোকে গ্রহণ করা। আজকেরর বিজ্ঞ ইসলামী চিন্তাবিদ, রাজনীতিবিদ ও ইসলামিস্টদের বিশাল একটা অংশ মনে করেন এই সামাজিক বিজ্ঞানগুলোকে কেবল তাত্ত্বিক এবং নিরপেক্ষ (abstract & value neutral)। তারা মনে করেন, এগুলো থেকে বের হয়ে আসা পলিসিগুলো যেকোন ব্যক্তি বা জীবনব্যবস্থার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। সামাজিক বিজ্ঞানগুলোকে তারা কোন যন্ত্র বা উপকরনের মতো করে দেখেন, যেগুলোকে ইচ্ছে অনুযায়ী যেকোন কাজে চালানো যায়। এ কারনেই পশ্চিমা শিক্ষা ও দর্শনের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি হল ‘ভালোর গ্রহন ও মন্দের বর্জন” এর।

কিন্তু বাস্তবতা হল অর্থনীতিসহ অন্যান্য সামাজিক বিজ্ঞানগুলো নিরপেক্ষ (value neutral) না। বরং ইসলামী শিক্ষার মতো পশ্চিমা এ সামাজিক বিজ্ঞানগুলোরও আছে সুনির্দিষ্ট উৎস ও উদ্দেশ্য। পশ্চিমা সামাজিক বিজ্ঞানগুলো মানব জাতির সামস্টিক চিন্তাধারার ওপর প্রতিষ্ঠিত কোন ধ্রুব ও অপরিবর্তনীয় সত্য বা মূলতত্ত্ব তুলে ধরে না। এটা তাদের উদ্দেশ্যও না। বরং সামাজিক বিজ্ঞানগুলো কাজ করে ব্যক্তির একটি বিশেষ সংজ্ঞাকে ঘিরে, যাকে Human Being বা ব্যাক্তিমানব বলা হয়ে থাকে। সামাজিক বিজ্ঞানগুলোর মতো ব্যক্তির এই নির্দিষ্ট ধারণা ও সংজ্ঞাও এনলাইটেনমেন্টের ফসল।

হিউম্যান বিয়িং এর এই ধারনা ব্যক্তিস্বাধীনতাকে স্বতঃসিদ্ধ সত্য হিসেবে ধরে নেয় (freedom as self-evident value)। হিউম্যান বিয়িং মানে কিন্তু শুধু মানুষ না। সে হল এমন কেউ যে নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ ও অমুখাপেক্ষী মনে করে। বিভিন্ন জীবনব্যবস্থা ও দর্শনকে সে মূল্যায়ন করে একটি ও কেবল একটি মাপকাঠি দিয়ে। মানবিক চাহিদা। মানবিক চাহিদা ও কামনা-বাসনার সীমাহীন পূর্ণতাই এই ব্যাক্তিমানবের জীবনের উদ্দেশ্য। অর্থাৎ সীমাহীন অর্থনৈতিক উন্নতি।

অর্থনীতির পুরো কাঠামো গড়ে উঠেছে ব্যাক্তির এই নির্দিষ্ট সংজ্ঞা ও এর অন্তর্নিহিত মূলনীতিগুলোর ওপর ভিত্তি করে। অর্থনীতির সব বিশ্লেষণ ও তত্ত্ব এমন একজন ব্যক্তি বা একোনমিক এজেন্টকে ঘিরে তৈরি করা যে,

১) কেবল তার ব্যক্তিস্বার্থের প্রতি নিবেদিত

২) যে বিশ্বাস করে সর্বোচ্চ স্বার্থ অর্জিত হয় সর্বোচ্চ ব্যাক্তি স্বাধীনতার মাধ্যমে । অর্থাৎ আমার জন্য কোনটা ঠিক সেটা আমিই ঠিক করবো। ব্যক্তির স্বার্থ নির্ভর করে ইচ্ছেমতো যেকোন কিছু করার সক্ষমতা ও স্বাধীনতার ওপর।

৩) অন্য কারো ঠিক করে দেয়া ভালোমন্দের মাপকাঠি গ্রহণ বা বর্জনে ব্যাক্তি বাধ্য না। কোন উচ্চতর শক্তির ঠিক করে দেয়া নৈতিকতা মেনে চলা ব্যক্তিমানবের (Human Being) দায়িত্ব না । কান্টের ভাষায়, ব্যাক্তি স্বাধীন, স্বশাসিত (autonomous) । তার জীবনে কী করা উচিৎ, এ প্রশ্নের জবাব দেয়ার অধিকার শুধুই তার নিজের। অন্য কোন কর্তৃপক্ষের এ প্রশ্নের জবাব দেয়ার অধিকার আছে বলে স্বাধীন ব্যক্তি স্বীকার করে না ।

৪) কোন নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে কী বেছে নেয়া হচ্ছে তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হল তার “যেকোন কিছু বেছে নেয়ার স্বাধীনতা ও সক্ষমতা” থাকা

৫) যেহেতু স্বাধীনতার বস্তুগত প্রকাশ (material manifestation) পুঁজির মাধ্যমে ঘতে, তাই নিজের ইচ্ছে ও পছন্দ অনুযায়ী যেকোন কিছু বেছে নেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় টাকা থাকাটাই দিনশেষে ব্যক্তিমানবের (Human Being) কাছে মুখ্য। আর সে কী পছন্দ করবে, কোনটা বেছে নেবে তা একান্তই তার ব্যক্তিগত ব্যাপার, আর কারো অধিকার নেই এ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করার।
সবগুলো সামাজিক বিজ্ঞানের উদ্দেশ্য হল এই হিউম্যান বিয়িংয়ের জন্য উপযুক্ত বাজার, সমাজ, শক্তি ও সরকার গড়ে তোলা। যেমন অর্থনীতির উদ্দেশ্য হল অর্থনৈতিকভাবে ব্যক্তির উন্নতির ক্ষেত্র ও সুযোগগুলোকে সহজ থেকে সহজতর করার লক্ষ্যে উপযুক্ত পুঁজিবাদী ব্যবস্থা, কাঠামো সমাজ ও নেতৃত্ব প্রস্তুত করা।

এইসব বাস্তবতাকে ভুলে গিয়ে যখন আমরা ইসলামী গণতন্ত্র, অর্থনীতি, ব্যাংক বা অন্য কিছু বানাতে ব্যস্ত হয়ে যাই তখন সেটা বাস্তবতা অনুধাবনের ক্ষেত্রে চরম ব্যার্থতা।

মূল - ইসলামী ব্যাংক: ভুল প্রশ্নের ভুল উত্তর