প্রচলিত ইসলামী অর্থনীতি কোনো স্বতন্ত্র চিন্তার প্রতিনিধিত্ব করে না; বরং এটি নানারকমের আদর্শিক জোড়াতালির ফসল। ইসলামী অর্থনীতিবিদদের চিন্তাধারা হলো সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক অর্থনীতিবিদদের চিন্তার একটি উন্নত রূপমাত্র। ইসলামী অর্থনীতির বক্তব্য হলো, অর্থনীতিতে ইসলামী নির্দেশনা যেমন সুদের নিষিদ্ধতা, যাকাত-ব্যবস্থা ইত্যাদি বাস্তবায়নের ফলাফল হলো সমাজে ভোগ ও বিলাসিতার আরও বেশি সুযোগ ও ক্ষেত্র তৈরি হওয়া। তারা আরও মনে করেন যে প্রকৃত উন্নতি তখনই সম্ভব হবে যখন ইসলামী বিধিনিষেধের অধীনে উপযোগ ও মুনাফা সর্বোচ্চকরণ করা হবে। যেন ইসলামী শিক্ষার ওপর আমল করার পরই কান্টের Kingdom of Ends ও মার্ক্সিস্ট কল্পরাজ্যের সঠিক বাস্তবায়ন হবে।

অন্য ভাবে বলা যায়, ইসলামী অর্থনীতিবিদদের বক্তব্য হলো, পুঁজিবাদীরা যে গন্তব্য ঠিক করেছে সেটা ঠিক আছে। কিন্তু তাদের পথ পুরোপুরি সঠিক না; বরং এর সঠিক পথ ও পন্থা চৌদ্দ শ বছর ধরে ইসলামের মাঝে সংরক্ষিত আছে। ইসলামী অর্থনীতির এই মডেলের দ্বারা পুঁজিবাদের এমনই একনিষ্ঠ ও নিস্বার্থ সেবা হচ্ছে যে, পশ্চিমা ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো যেখানে ইসলামের অন্যান্য আহকাম ও নিদর্শনগুলো মিটিয়ে দিতে কাজ করছে, সেখানে তারাই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে উৎসাহের সাথে ইসলামী অর্থনীতি ও ব্যাংকি-ব্যবস্থাকে সমর্থন করছে, সুযোগ দিচ্ছে, এবং নিজেদের দেশে বাস্তবায়ন করছে। মনে হয় এটাই ইসলামের প্রথম হুকুম, যার ওপর আমল করার জন্য মুসলিমদের চেয়েও কাফিররা বেশি আগ্রহী!

দুঃখের বিষয় হলো পুঁজিবাদের ইসলামী বৈধতা তৈরির এ ব্যবস্থার সুন্দর একটি নামও রাখা হয়েছে—শারীয়াহ কমপ্লায়েন্ট। যার মানে হল, শরীয়াহর গণ্ডিধীন পুঁজিবাদ—শরীয়াহসম্মত পুঁজিবাদ। ইসলামী অর্থনীতিবিদরা দাবি করেন, ইসলামী আখলাক তথা চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলো পুজিবাদের ভেতর প্রয়োগ করা সম্ভব। তারা আশা করেন এই হিকমাহপূর্ণ আমলের মাধ্যমে ইসলামের কল্যাণ হবে।

আত্মপ্রতারণার এর চেয়ে ভালো উদাহরণ আর কী হতে পারে!

সামগ্রিকভাবে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ধ্বংস এই কর্মপদ্ধতির উদ্দেশ্য না; বরং এর উদ্দেশ্য হলো পুঁজিবাদের ইসলামী সংস্করণ তৈরি করা। এই হিকমাতে আমালির উদ্ভাবক চিন্তাবিদরা কখনোই এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেন না যে নামধারী এই শরীয়াহ-কমপ্লায়েন্সের ফলে যে ধরনের ব্যক্তিত্ব, সামাজিকতা, সমাজ-ব্যবস্থা ও লাইফ-স্টাইলের প্রচলন ব্যাপক হচ্ছে সেগুলো কি ইসলামী নাকি পুঁজিবাদী? সুদবিহীন ব্যাংকিং এর নামে উন্নত জীবনের জন্য মানুষকে প্রাতিষ্ঠানিক সিস্টেমে ঋণ দিয়ে তাদের কিসের শিক্ষা দেয়া হয়? দুনিয়াবিমুখতার নাকি ভোগের? শেষে এমন কেন হয় যে, ব্যবহার হলো ইসলামী ফ্রেমওয়ার্ক কিন্তু উন্নতি হলো পুঁজিবাদের?

এই চিন্তাবিদরা হয় পুঁজিবাদ সম্পর্কে জানেন না, অথবা ইসলাম নিয়ে জানেন না। পুঁজিবাদকে ইসলামীকরণের এই পদ্ধতি আসলে ইসলামী শাসন-ব্যবস্থার পুনরুজ্জীবিত করার কাজ না; বরং এ প্রচেষ্টাকে দুর্বল করার কাজ। এই পদ্ধতি অনুসরণের ফলে দ্বীনের নামে দুনিয়াপাগল একটি শ্রেণি তৈরি হচ্ছে। একই সাথে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে ইসলামী ফিকহের একটি অসম্পূর্ণ রূপ।

সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এমন ইসলামীকরণের পদ্ধতি ও কৌশলের ফলে কোনোদিনও এমন এক জোয়ারের জন্ম হবে না, যার ফলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহ এবং খিলাফাহ রাশিদাহয় প্রত্যাবর্তন সম্ভব হবে; বরং এ ধরনের পদ্ধতি অনুসরণের মাধ্যমে আমরা আসলে শরীয়াহকে নির্দিষ্ট কিছু কাজ ভেবে নিয়ে অবস্থার দোহাই দিয়ে ছাড়াছাড়ির চিন্তায় বিভোর হয়ে আছি, যাতে করে মানুষের জন্য শরীয়াহর সীমার মধ্যে থেকে খাহেশাতের ওপর চলা সম্ভব হয়। ইসলাম যেন এমন এক জীবনব্যবস্থা, যার পলিসি সর্বোচ্চ ও চূড়ান্ত লক্ষ্য (optimal) অর্জনের বদলে সর্বনিম্ন লক্ষ্য (minimal) অর্জনের ভিত্তিতে গঠিত হয়। এটি আপন কবর খোঁড়ার নামান্তর। কারণ, মানবজীবনের কর্মপরিধির মাঝে কোনো ব্যবস্থার বিলুপ্তির অর্থই হচ্ছে সেখানে অন্য কোনো ব্যবস্থা চালু হওয়া।

এ কারণেই যত দিন যাচ্ছে, ইসলামী ব্যাংকিং-ব্যবস্থা ও সুদি ব্যাংকিং ব্যবস্থার মধ্যে মিল তত বাড়ছে। হারাম বলে স্বীকৃত অর্থনৈতিক পণ্যগুলোকে শরয়ী বাহানা ব্যবহার করে বৈধ করার দ্বারা শরীয়াহর পরিধি বিলুপ্ত করা হচ্ছে। আর এই বিলুপ্তির ফলাফল ব্যক্তির স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসন বাড়ানো তথা নফসের গোলামি ছাড়া আর কিছুই না।

অধ্যায়: পুঁজিবাদের ইসলামীকরণ,
বই: ইসলামী ব্যাংক - ভুল প্রশ্নের ভুল উত্তর
মূল: মুহাম্মাদ যাহিদ সিদ্দিক মুঘল
অনুবাদ: ইফতেখার সিফাত
সম্পাদনা: আসিফ আদনান
প্রকাশনী: Ilmhouse Publication (প্রকাশিতব্য)